‘শিক্ষা’ এখনও মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি বাংলাদেশে

tkeditortkeditor
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:০৪ PM, ০২ এপ্রিল ২০১৬

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশে ‘শিক্ষা’ এখনও মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি অথচ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এখন সুপেয় পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার পাশাপাশি অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসাকেও আমাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে ‘মৌলিক বিষয়’ (ফান্ডামেন্টাল প্রিন্সিপ্যালস) বলা হয়েছে।
অথচ সার্কভুক্ত দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশ শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও শিক্ষা এখনো ‘সুযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এটার সাংবিধানিক স্বীকৃতি মিলেনি।
জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরিত দেশ হিসেবেও শিক্ষা বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার হিসেবে বিবেচ্য। পাশের দেশ ভারত ২০০৬ সালে, শ্রীলঙ্কা ২০০৩ সালে ও নেপাল ২০১৩ সালে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা এখনো ‘সুযোগ’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাকে শিগগিরই ‘মৌলিক চাহিদা’র পরিবর্তে ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। রাষ্ট্রের উচিত প্রতিটি শিশুর জন্য মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। প্রতিটি গ্রামে কমপক্ষে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক, স্কুলে দুপুরের খাবার, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা। শিক্ষা যখন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত অধিকার হবে, তখন এইখাতে সরকারি উদ্যোগ ও বাজেটও বাড়বে বলে তারা মনে করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রাথমিকে ২৬ দশমিক ২ ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। এর মধ্যে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের ঝরে পড়ার সংখ্যা বেশি। আর মাধ্যমিকে প্রায় ৪৬ ভাগ এবং কলেজ পর্যায়ে প্রায় ২২ ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। প্রাথমিকে ছেলেদের ঝরে পড়ার সংখ্যা বেশি হলেও মাধ্যমিক ও কলেজে মেয়েদের ঝরে পড়ার সংখ্যা বেশি।
দেশের স্কুলগুলোতে শিক্ষা ও শিক্ষকদের মানোন্নয়ন বিষয়ে জরিপ করে ‘আমার অধিকার ফাউন্ডেশন’। এ ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন শিশির শীল বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেছি, শিক্ষকদের মান খুবই নিম্ন পর্যায়ে। সেখানে শিশুরা যে মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠছে না এটা বুঝতে কষ্ট হয় না। ফলে সরকারের সকল উদ্যোগ তৃণমূলে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই শিক্ষাকে অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষা প্রদানের মান নিয়ন্ত্রণও সমানভাবেই জরুরি।’
জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজিতে প্রাথমিক শিক্ষায় শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝরে পড়ার হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল বাংলাদেশের। ২০০০ সালে ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি এমডিজির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ডিসেম্বরে।
নতুন করে শুরু হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি। প্রাথমিক শিক্ষায় গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতি কতটুকু, তা জানতে গিয়ে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভর্তির হার শতভাগের কাছাকাছি গেলেও ঝরে পড়ার হার গড়ে এখনো ২০ শতাংশের ওপরেই রয়ে গেছে। আর পার্বত্য ও হাওরাঞ্চলে এই হার আরো বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনগত অধিকার না থাকায়, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে, সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার অর্জনে ব্যক্তিবিশেষের বা রাষ্ট্রের করুণার ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিটি শিশুর জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বুনিয়াদি শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষা-পরবর্তী শিক্ষা জীবনের ভিত্তিভূমি রচনা করে।
শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগ এবং পর্যাপ্ত সমর্থন না থাকায় হতদরিদ্ররা সর্বদাই বঞ্চিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরে আজও আমাদের শিক্ষার অধিকারের দাবি আদায়ের জন্য নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি না থাকায় শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ আশানুরূপ নয়। সর্বশেষ ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটেও শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
দেশে শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্নেহাল ভি সোনেজি বললেন, ‘এটা ঠিক যে শিক্ষা প্রসারে সরকারের ব্যাপক কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এটাই যথেষ্ট নয়। মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে তুলে আনতে হলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি শিক্ষাতেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেই হবে। এর বিকল্প নেই।’
বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে আঠারোটি মৌলিক অধিকারেbangla2র কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ২৭-৪৪ পর্যন্ত); যার কোথাও শিক্ষার কথা বলা হয়নি। অথচ পাশের দেশগুলোর সংবিধানে শিক্ষা ‘মৌলিক অধিকার’ হিসাবে স্বীকৃত। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১(ক), নেপালের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭ এবং মালদ্বীপের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬-এ শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বললেন, সংবিধানে শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া সরকারের দায়িত্ব। একইসঙ্গে কাজ করাটাও জরুরি। অনেক আইন রয়েছে যা মানা হয় না। তাই আইন করতে হবে আর তা মানতেও হবে। তিনি বলেন, আমাদের উচিত হবে অতি দ্রুত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং তা বাধ্যতামূলক করা।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘শিক্ষা আইন করা হচ্ছে। এ আইনে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টি রাখা হবে। তাছাড়া শিক্ষা নীতিতেও আমরা অধিকার এর বিষয়টি বলেছি। সরকার শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করছে। সে লক্ষ্যে যেখানে যে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন সে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

জেলার খবর

আপনার মতামত লিখুন :