ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাঁশায় রংপুরের কৃষক

tkeditortkeditor
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:৪৭ PM, ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫

রংপুর সংবাদদাতা : অগ্রহায়ণ মাস শুরু হতেই রংপুরসহ দেশের প্রতিটা কৃষকের ঘরে পুরোদমে শুরু হয় ধান কাটা ও মাড়াইয়ের উৎসব।  এখন পুরোদমে চলছে আমন ধান কাটা, মাড়াই ও বাজারজাত করার ব্যস্ততা।  প্রত্যেক চাষীর ঘরে ঘরে চলছে নবান্নর উৎসব।
নতুন চালের সুবাস যেন পুলকিত করছে কৃষকের ঘর।  এছাড়া আগাম জাতের ধান উৎপাদন করে বেশ ভালো বাজারদরও পেতেন তারাঁ।  ধান বিক্রির টাকায় পরিশোধ করতেন পুরনো দাদন ঋণ।  পুনরুৎপাদনের জন্য সংরক্ষণ করতেন প্রয়োজনীয় পুঁজি।
কিন্তু সম্পূর্ণ এর ব্যতিক্রম ঘটেছে এবার রংপুর অঞ্চলে।  প্রথমেই অনাবৃষ্টির কবলে পরেন কৃষকেরা।  পরে খরা সামাল দিতে বৈদ্যুতিক সেচ পাম্প দিয়ে আমন চারা রোপন করতে হয় তাদের।  কিন্তু দফায় দফায় বন্যা মোকাবেলা করে নাজেহাল হয়েছে রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের আট জেলার কৃষক।
এরপরো থেমে থাকেনি তারা।  ক্ষেতে ফলিয়েছেন তাদের প্রত্যাশিত স্বপ্ন।  কিন্তু সব বাঁধা-বিপত্তিকে পেছনে রেখে সোনালি স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেও হতাঁশা পিছু ছাড়েনি তাদের।  কৃষকের উৎপাদিত নতুন ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেকটা হতাঁশ এ অঞ্চলের কৃষক।  তবে প্রকৃত ধানের বাজার মূল্য না পাওয়ার পিছনে ভারত থেকে আমদানিকৃত চাল প্রধান কারণ বলে মনে করছেন চাষীরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এ বছরে চলতি আমন মৌসুমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল।  উৎপাদিত চালের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রায় ৪ লাখ ৫২ হাজার ৮০৭ মে.টন।  কিন্তু দফায় দফায় বন্যায় প্রাকৃতিক ক্ষয়ক্ষতি ও পুনঃরোপণ হিসাব যোগ-বিয়োগ করে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৪০৩ হেক্টর জমিতে।
জেলা কৃষি সম্প্রপ্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক মকবুল হোসেন জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর পুনঃরোপণ করায় আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোনো শঙ্কা নেই।  চলতি মৌসুমে আমনের আশাতীত ফলন হয়েছে।  ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৯ ভাগ জমির ধান কাটা হয়েছে।  আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ ধান কাটা শেষ হবে।
পীরগাছা উপজেলার কান্দিরহাট এলাকার বাসিন্দা হযরত আলী জানান, তিনি চলতি মৌসুমে দেড় একর জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন।  মৌসুমের শুরুতে খরা থাকায় তার জমিতে কৃত্রিম সেচ দিতে হয়েছে।  এর পরে দুই দফা বন্যার পানিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয় ধানের জমি।  হাড়ভাঙা খাঁটুনি খেটে ৮২ শতক জমির ধান রক্ষা করতে পারি।  তবে গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন খরচ হয়েছে তার দ্বিগুণ বেশি।  তার উৎপাদিত ৮২শতক জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে মাত্র ২৪ মণ।  কিন্তু বাজারদর কম হওয়ায় বোরো মৌসুম ধান আবাদ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তিনি।
শুধু হযরত আলীই নয়, জেলার অধিকাংশ কৃষক একই কথা বলছেন।  তারা জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে ধান উৎপাদন করায় খরচও বেড়েছে দ্বিগুণ।  কিন্তু ভারতীয় চাল আমদানির কারণে বাজারে নতুন ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত তারা।  আমদানিকৃত চাল এখন তাদের জন্য ঘাঁয়ের উপর বিশ ফোড়া হয়ে গেছে।  ফলে চলতি মৌসুমে ধান আবাদে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে অনেক কৃষক জানিয়েছে।
জেলা কৃষি বিপণন অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলার অধিকাংশ হাটবাজারে এখন মোটা ধান (হাইব্রিড) মণ প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৬০ এবং মাঝারি সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়।  গত বছর ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত মোটা ধান মণ প্রতি বিক্রি হয়েছে ৬৮০ থেকে ৭২০ টাকায় ও মাঝারি ধান বিক্রি হয়েছে ৭৪০ থেকে ৭৬০ টাকায়।
কৃষি বিপণন অধিদফতরের জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা এএসএম হাসান সারোওয়ার জানান, মৌসুমের শুরুতেই ধানের বাজারদরের এ নিম্নমুখী প্রবণতা কৃষকের জন্য খুবই হতাশাজনক।  একই সঙ্গে ভারত থেকে আমদানি করা চাল বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।  এ অসম প্রতিযোগিতায় স্থানীয় চাল ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।  এখন ধানের দর কেজিপ্রতি ১৮ টাকা হলে চাষীদের উৎপাদন খরচ উঠে কিছু লাভ থাকত।

আপনার মতামত লিখুন :