ঠাকুরগাঁওয়ের সেই আবেদ আলী পাগলা এখন লোকচক্ষুর আড়ালে

tkeditortkeditor
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৫:০৯ PM, ১৬ মে ২০১৬

রবিউল এহসান রিপন : পাঁচশ বা এক হাজার টাকার একটি নোট খুচরা করতে দিয়ে আপনি ভুলে গেলেও ফেরত দিতে ভুলেন না তিনি। অথবা আপনি টাকা খুচরা করতে দিয়ে ভুলে চলে গেছেন অন্য জায়গায়, আপনাকে পুরো শহর খুঁজে টাকা ফেরত দিয়ে আসবেন তিনি।এটাই হলো আবেদ আলী পাগলার বৈশিষ্ট্য।

এছাড়াও শহরের চৌরাস্তা মোড়ে যানজট বেড়ে গেলে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে যানজট নিরসনে কাজ করেন তিনি। কখনো কাউকে বিরক্তও করেন নি তিনি। কেউ খেতে দিলে খেয়েছেন। না দিলে, শহরের বড় মসজিদের এক কোণে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। গুম থেকে উঠে সকালেই শহরের পত্রিকার দোকানে গিয়ে সবনিম্ন ২০টি পত্রিকা পড়তেন তিনি। তবে তিনি ইংরেজিতে পটু ছিলেন বলে শহরের অনেকে জানিয়েছেন।

অসংখ্য ভালো গুণের এই মানুষটি ঠাকুরগাঁও শহরে সবার কাছে পরিচিত আবেদ আলী পাগলা নামে। তার ভালো গুণগুলোর কারণে কেউ আবেদ আলীর নাম মুখে না আনলেও। তার কিছু কান্ড দেখে সবাই দিনে অন্তত কয়েকবার তার নামটি মুখে নিত। যেমন, কেউ দুই থেকে তিনটা কাপড় গায়ে পড়লেই লোকজনে বলতো কিরে আবেদ আলী পাগলা হইছিস নাকি।

এর কারণ হলো, আবেদ আলীর গায়ে সবসময় ৪-৫টা শার্ট ও একটি লাল ব্লেজার থাকতো। সেটা গরম বা ঠান্ডা, যে আবহাওয়াই হোক না কেন। সেই সঙ্গে তার গলায় থাকতো একটি বাঁশি। যেখানেই যানজট দেখতেন তিনি সেখানেই বাঁশিতে ফুঁ দিতেন।

গত কয়েক বছর ধরে ঠাকুরগাঁও শহরের সবার পরিচিত সেই আবেদ আলী লোক চক্ষুর আড়ালে চয়ে যায়। তিনি এখন অসুস্থ হয়ে বাড়িতেই থাকছেন। শহরে আবেদ আলীর ভক্তদের অনুরোধে এই প্রতিবেদক খুঁজতে শুরু করে তাকে।

অবশেষে ঠাকুরগাঁও শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের দানার হাট এলাকায় তার নিজ বাড়িতে পাওয়া যায় আবেদ আলীকে। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৯৫ বছর। তবে এলাকার কেউ তার বয়সটা সঠিকভাবে জানাতে পারেন নি।

তিনি ওই গ্রামের বুধু মোহাম্মদের ছেলে। পাকিস্তান আমলে ওই এলাকার বেগুন বাড়ি মাদরাসা থেকে তিনি দাখিল পাশ করেন। সেই সময়ে এলাকার দু-চার জন শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে আবেদ আলী একজন।

১৯৫৬ সালে দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ এলাকার এক মধ্যবর্তী পরিবারের মেয়ে মমেনা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন তিনি। বিয়ের পর কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। তার ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে। সন্তানদের নিয়ে সুখেই দিনাযাপন করছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর আক্রমণ শুরু করেন। শুরু হয় যুদ্ধ। এসময় আবেদ আলী পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ে চলে আসেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আবেদ আলী মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহ সহ তাদের পত্র পত্রিকার খবর পড়ে শুনাতেন। অবশেষে দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু আবেদ আলী মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই পরিবারের লোকজনের খোঁজ খবর নেওয়া ছেড়ে দেন এবং শহরেই থেকে যান তিনি।

জানা যায়, ২০১০ সালে আবেদ আলী ঠাকুরগাঁও ছেড়ে চলে যান গ্রামের বাড়ি দানারদাহে। গত ছয় বছর ধরে তিনি শয্যাশায়ী। চিকিৎসা করাতে পারছেন না তার পরিবারের লোকজন। বর্তমানে তার জীবন কাটছে অনাহারে অর্ধাহারে।

শনিবার আবেদ আলীর দানার হাটের বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে প্রথমেই তিনি শহরের প্রিয় মানুষগুলো কেমন আছে জানতে চান। অথচ তার সেই প্রিয় মানুষগুলো জানেন না কি অবস্থায় আছেন তাদের ভক্ত আবেদ আলী।

শহরের গাওসিয়া হোটেলের মালিক মোহাম্মদ বারেকাল্লাহ জানান, আবেদ আলী পাগলা খুব শান্ত মানুষ। সে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রায় ৩০-৩৫ বছর ছিল। কিন্তু সে কোনদিন কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে নাই। যে যা দিত তাই খেয়ে মসজিদে শুয়ে থাকতো। শান্ত মানুষ হওয়ায় সকলে তাকে ভালোবাসতো।

জেলার প্রবীণ সাংবাদিক মনসুর আলী জানান, শিক্ষিত পাগল ছিল আবেদ আলী। সে ইংরেজি পত্রিকা ছাড়া অন্য কোনো পত্রিকা পড়তো না। মাঝে মাঝে ইংরেজিতে কথা বলতো। কাউকে কোনো প্রকার বিরক্ত না করার কারণে সকলে তাকে নিজ ইচ্ছায় সহযোগিতা করতো। মসজিদে থাকতো এবং সবসময় ৬-৭ টা করে জামা কাপড় পড়তো।

ছাত্রনেতা আমিনুল ইসলাম সোহাগ জানান, আবেদ আলী পাগলা ছিল সমাজসেবক মানুষ। সে একটা বাঁশি নিয়ে চৌরাস্তায় ট্রাফিকের কাজ করতো মাঝে মধ্যে। এছাড়াও শহরে যানজট লাগলে সে বাঁশি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়তো। আমার খুবই প্রিয় মানুষ ছিল আবেদ আলী পাগলা।

আবেদ আলীর ছেলে মহিম উদ্দিন জানান, বাবা ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের অনেক প্রিয় ছিল। এখন বয়স হওয়ার কারণে আর শহরে যেতে পারে না। অসুস্থতার কারণে শেষ জীবনে বাসায় না খেয়ে পড়ে আছে। আমরা গরিব মানুষ। যতটুকু পারি বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। কিন্তু আর পারছি না। যদি কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে তাহলে হয়তো শেষ সময়ে বাবার চিকিৎসা করাতে পারবো।

জেলার খবর

আপনার মতামত লিখুন :